উৎপাদন সংকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

বড় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চয়তা চায় বিপিডিবি

জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার বড় একটা অংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার বড় একটা অংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে গ্যাস সংকট থাকায় নারায়ণগঞ্জে স্থাপিত সামিট, ইউনিক ও রিলায়েন্সের গ্যাসভিত্তিক বৃহৎ তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ বিবেচনায় এসব কেন্দ্র উৎপাদনে রাখতে চায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এজন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের (গ্যাস কিংবা এলএনজি) নিশ্চয়তা চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সংস্থাটি চিঠি দিয়েছে।

বিপিডিবির চিঠিতে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর থার্মাল ইফিশিয়েন্সি অনেক বেশি। এগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখা বিদ্যুৎ সিস্টেমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব কেন্দ্র চালু থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে।

মেঘনাঘাটে স্থাপিত গ্যাসভিত্তিক এ তিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা মোট ১ হাজার ৮৮৫ মেগাওয়াট। এরই মধ্যে সামিটের ৫৮৩ মেগাওয়াট ও ইউনিক গ্রুপের ৫৮৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে রয়েছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা যাচ্ছে না। কখনো কখনো ব্যবহার হয় অর্ধেক সক্ষমতা। বর্তমানে অবশ্য দুটি কেন্দ্রই বন্ধ রয়েছে। রিলায়েন্সের ৭১৮ মেগাওয়াট কেন্দ্রটিও গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে চালু হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, নারায়ণগঞ্জে গ্যাসভিত্তিক বড় তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ দেয়া যাচ্ছে না মূলত সেখানকার পাইপলাইনের পর্যাপ্ত সক্ষমতার অভাবে। আবার গ্যাস সংকটের বিষয়টিও অস্বীকার করেননি জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাসভিত্তিক বড় তিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস পর্যাপ্ত থাকলেও দেয়া যায় না। কারণ সেখানে বিদ্যমান পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা কম। তবু সেখানকার গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিসংক্রান্ত কোনো চিঠি বিদ্যুৎ বিভাগে এলে সেটি দেখা হবে।’

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্বাভাবিকভাবে চালু রাখতে হলে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২৫০ এমএমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন। সেখানে সরবরাহ হচ্ছে দিনে ৯০০-৯৩০ এমএমসিএফ পর্যন্ত। সংকট থাকার কারণেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে না। অন্যদিকে বিপিডিবির কাছে জ্বালানি বিভাগের বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া থাকায়ও গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগসংশ্লিষ্টরা।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে সামিট ও ইউনিকের বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটিতে গ্যাস দেয়া হচ্ছে। তবে তাদের যে চাহিদা সে পরিমাণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বিদ্যুতে যে পরিমাণ জ্বালানিটির চাহিদা তার ২৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া গ্যাস সরবরাহ বাবদ বিপিডিবির কাছে বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থ না পেলে গ্যাস সরবরাহও বাড়ানো যাচ্ছে না।’

তবে রিলায়েন্সের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ দেয়া যাবে কিনা সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক বড় সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে। তবে এসব কেন্দ্রে জ্বালানি আমদানির মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বেশ কয়েকটি ইউনিট।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়লা সংকটে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি (৬৬০ মেগাওয়াট) রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে। আগামী দুই মাস বন্ধ থাকবে এ ইউনিট। বাগেরহাটে রামপালের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রটিরও একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে বরিশালের ৩০৭ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও। চট্টগ্রামে বাঁশখালীর বেসরকারি এসএস পাওয়ারের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ইউনিটও বন্ধ রয়েছে বর্তমানে। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি করা আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় গতকালও সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৬৭০ মেগাওয়াট।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর জন্য কয়লা আমদানির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে এ কেন্দ্রের কয়লা দেশে আসবে। এছাড়া পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে গেছে। আসন্ন শীত মৌসুম ও বিদ্যুৎ চাহিদা এ সময়ে কম থাকে বিধায় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এ সময়টি বেছে নেয়া হয়।’

আরও